উজিরপুর প্রতিনিধিঃ চুরির অপবাদে বাজারের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের শিকার সেই রায়হানুল হক অনিককে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে (রিহ্যাব) পাঠানো হয়েছে।
সোমবার দুপুরে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তাকে তিন মাসের চিকিৎসার জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে অনিক সুস্থ হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।
বামরাইল বাজারে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় অনিককে তার ছোট্ট মেয়ে তুবা বিনতে অরনির রুটি ও চা খাওয়ানোর দৃশ্যের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসে বাবা-মেয়ের হৃদয়স্পর্শী সম্পর্ক। ভিডিওতে দেখা যায়, বাবাকে মারধর না করার জন্য শিশুটি উপস্থিত লোকজনের কাছে আকুতি জানাচ্ছে। পরে দোকান থেকে রুটি, চা ও পানি এনে নিজের হাতে বাবাকে খাওয়ায় তুবা।
ঘটনার পর অনিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ান উজিরপুরের ইউএনও মো. আলী সুজা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি অনিকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। অনিক ও তার স্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অনিক কিছুটা মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। পরিবারের সম্মতিতে তাকে চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে সোমবার তাকে রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে।
বাবাকে বিদায় দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা। সে বলে, ‘আমার বাবা ভালো বাবা। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে।’ বাবার সঙ্গে অন্যায় না হওয়ার পাশাপাশি তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুন—এটাই তার চাওয়া। টানা কয়েকদিন বাবাকে নিজের কাছে আগলে রাখার পর এবার তিন মাস বাবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ছোট্ট তুবাকে।
অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস জানান, তাদের সংসারে নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস নেই। তিনি এইচএসসি পাস। তাদের দুই সন্তান—তুবা (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। স্বামী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি। অনিকও জানিয়েছেন, তিনি নিজেকে বদলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে চান তিনি।
অন্যদিকে, অনিকের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। তার দাবি, তার কাছ থেকে কোনো চোরাই মালামাল উদ্ধার হয়নি এবং চুরির অভিযোগের পক্ষেও তাকে কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি। তবে অনিকের মাদকাসক্তির বিষয়ে পরিবারের বক্তব্য ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে চিকিৎসার জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, অনিক চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জানান, অনিক রিহ্যাবে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী ও সন্তানদের প্রয়োজনীয় সহায়তা স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রবাসীদের সহযোগিতায় নিশ্চিত করা হবে। তুবার পড়ালেখার খোঁজখবরও তিনি নিয়েছেন। তার স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবেও তুবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তুবার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে বামরাইল বাজারে চুরির চেষ্টার অভিযোগ তুলে অনিককে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরদিন সকালে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় তার মেয়ে তুবা। সারারাত না খেয়ে থাকা বাবার জন্য বাজারের দোকান থেকে রুটি ও চা এনে নিজের হাতে খাওয়ানোর সেই দৃশ্য ধারণ করে এক যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয় এবং অনিককে চিকিৎসার জন্য রিহ্যাবে পাঠানো হয়।

