Take a fresh look at your lifestyle.

ফের বাংলাদেশে জাল পণ্য ছড়াচ্ছে চীন!

৪১

আঁকার কাগজের আড়ালে বাংলাদেশে সিগারেটের নকল মোড়ক ও স্ট্যাম্প রফতানির অভিযোগ উঠেছে ‘অ্যান্টি ফেক’ নামধারী এক চীনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ডিজি অ্যান্টি ফেক (শেনজেন) নামে ওই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে ১৪ টন এ-৪ কাগজ পাঠিয়েছিল। তবে সেই কাগজের প্যাকেটে ছিল সিগারেটের নকল মোড়ক, প্যাকেট ও স্ট্যাম্প।

গত বছরের (২০২১) ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে ১৪.৬৪ টন নকল পণ্য আটক করে বাংলাদেশ কাস্টম কর্তৃপক্ষ। পণ্যগুলো আমদানি করেছিল বাপ্পু এন্টারপ্রাইজ (বাপ্পু বড়ুয়া), আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছিল মফিজুর রহমান ও মো. ইলিয়াস (মধুমতি আ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড)।

দোকানদাররা জানান, কম মূল্যে পাওয়া যায় বলে অনেকেই চীনের পণ্য কেনেন। কিন্তু এই পণ্যগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় একদিন পরেই ক্রেতা ফেরত আসে পণ্য নিয়ে। এই পণ্যগুলো ফেরত দেয়ার কোন ব্যবস্থাও থাকে না। এ কারণে আমরা এখন পণ্য বিক্রির সময়ই বলে দেই ‘চাইনিজ মাল, কোন ওয়ারেন্টি নাই’

সিগারেট স্ট্যাম্পের নকল ব্যান্ড রোলগুলো মূলত এ-৪ কাগজের চালানের ভিতরে ঢুকিয়ে অবৈধ উপায়ে সিগারেট প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হতো। এতে দেশি হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হতো। এমনিতেই সিগারেটের ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সেখানে নকল মোড়কে ভুয়া সিগারেটে ধূমপান করিয়ে আরও ক্ষতি করতে চেয়েছে চীন!

চীনের এই নকল পণ্য সরবরাহের ঘটনা নতুন নয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকারি তদন্তে এমন জালিয়াতি বেরিয়ে আসে। যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন সড়ক ও সেতু প্রকল্পে সম্পৃক্ত চীনা কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) নির্মাণ সামগ্রী আমদানিতে কর ফাঁকি দিয়েছে।

আগের বছরের (২০২০) ডিসেম্বরেও চীনা জেডটিই করপোরেশনের বিরুদ্ধেও কর ফাঁকির অভিযোগে তদন্ত শুরু করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশের আরও তিনটি অবকাঠামো প্রকল্প থেকে সরতে হয়েছিল চীনা প্রতিষ্ঠানকে।

২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ৫০ লাখ টাকা ঘুস প্রস্তাবের কারণে চীনা কমিউনিকেশন অ্যান্ড কন্সট্রাকশন কোং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্প্রসারণে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে ২০ হাজার কোটি টাকা দাবি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া সীতাকুণ্ড থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ ও ১৬০ কিলোমিটার চার লেন এক্সপ্রেসওয়ে ও ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্পেও কাজ পেয়েছিল চীনা সিএইচইসি। সরকার পরে সেগুলো বাতিল করে।

এ বিষয়ে তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রতিষ্ঠানটি অভিজ্ঞতার জাল সনদ ও মিথ্যা তথ্য জমা দিয়েছিল। এছাড়া অতিরিক্ত মুনাফার লোভে তারা জালিয়াতির পথ বেছে নিয়েছিল। ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের (টিজেএন) একটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ও ব্যক্তিগত করের যে অর্থ ফাঁকি দেওয়া হয় তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেটের তিন-পঞ্চমাংশ ও বার্ষিক শিক্ষা বাজেটের ১৪ শতাংশের সমান।

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে ব্যবসা করছে তাতে তারা বিশ্বব্যাপীই নানা সন্দেহ ও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকল্পের ধীরগতি, অতিরিক্ত মুনাফার লোভে জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক নিয়ম অমান্য করায় বেশকিছু চীনা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে, চায়না ন্যাশনাল ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইইসি) মালিকানাধীন চায়না ইলেকট্রিক ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিইডিআরআই), চায়না এনার্জি কনজারভেশন অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ টেকনোলজি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি নিউ হোপ অ্যান্ড ট্যালরোড (বেইজিং), এনভায়রনমেন্টাল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড (সিইসিইপ নিউ হোপ), চায়না জিয়াংজু ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল করপোরেশন লিমিটেড (চায়না জিয়াংজু), চায়না মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রি কন্সট্রাকশন গ্রুপ, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মালিকানাধীন সহযোগী সংস্থা চায়না রেলওয়ে+২৩ ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন (আন্তর্জাতিক), চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোং (বিআরআই প্রকল্পের সবচেয়ে সক্রিয় কোম্পানিগুলির মধ্যে একটি)।

সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (বিইউসিজি) নতুন টার্মিনাল, কার্গো টার্মিনাল, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার, যাত্রী বোর্ডিং ব্রিজ নির্মাণের কাজ পেয়েছে বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ (বিইউসিজি)। তিন বছরের মধ্যে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দরে ২১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কিং এপ্রোন, ট্যাক্সিওয়ে, কার পার্কিং জোন ও লিংক রোড নির্মাণের প্রকল্পটি নজরে রেখেছে মালয়েশিয়া।

২০২১ সালের জুলাইয়ে পেনাং রাজ্যের সাবেক নির্বাহী কমিশনার বলেন, ‘পেনাংয়ের তলদেশে টানেল প্রকল্পটি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে করার কথা থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিবিদ (লিম গুয়ান ইঞ্জ) প্রথম থেকেই তাকে আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপের (বিইউসিজি) সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে চীনই প্রধান আর্থিক সহযোগিতাকারী। এছাড়া দেশগুলোর ব্যবসায়িক ও উন্নয়ন প্রকল্পেও চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। কিন্তু করপোরেট নীতিতে এরই মধ্যে তাদের খারাপ নীতির কারণে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও ভূমি আইন লঙ্ঘন করে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করেছে তারা।

এ কারণে চীনা সস্তা জিনিস থেকে সাবধান থাকা ভালো। একটা ইংরেজি প্রবাদে বলা হয়, ‘সস্তা জিনিস প্রিয় হলেও নষ্ট হয় দ্রুত’। শুধু তাই নয়, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে যে কোনো দুর্বল ও মানহীন পণ্যকে তুলনা করতে গিয়ে বলা হয়, ‘চাইনিজ পণ্য’। দেশে স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য মানহীন কম দামি মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপ, ফ্রিজ এমনকি বাইকও সরবরাহ করছে চীন।

রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি রাষ্ট্র চুক্তি ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জমি কিনতে পারে না। আন্তর্জাতিক এই আইনকে পাশ কাটাতে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বরিশাল বিভাগে পায়রা বন্দরকে ঘিরে চরা মূল্যে জমি কিনে রাখা হচ্ছে। বিশেষত নদী তীর ঘেঁষে কেনা হচ্ছে এসব জমি। ধারণা করা হচ্ছে নদী ঘিরে এবং পায়রা বন্দরকে লক্ষ্য করে এই আগ্রাসন চালাচ্ছে চীন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলেও অধিক মূল্যে জমি বিক্রির লোভে এখনও চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই জমি বিক্রি করছে স্থানীয়রা।

চীনের পণ্য ও কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে দেশের ব্যবসায়ী মহলে। স্বল্পমূল্যে পাওয়া এসব পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে প্রায়ই মনোমালিন্য হয়। বিষয়টি বোঝার জন্য স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে শুরু করে রাজধানীর আরও বেশকিছু বড় মার্কেটে ঘুরে দেখেছি। দোকানদাররা জানান, কম মূল্যে পাওয়া যায় বলে অনেকেই চীনের পণ্য কেনেন। কিন্তু এই পণ্যগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় একদিন পরই ক্রেতা ফেরত আসে পণ্য নিয়ে। এই পণ্যগুলো ফেরত দেয়ার কোন ব্যবস্থাও থাকে না। এ কারণে আমরা এখন পণ্য বিক্রির সময়ই বলে দেই ‘চাইনিজ মাল, কোন ওয়ারেন্টি নাই’।

বড় কনটেইনারে পণ্য নিয়ে আসা বেশকিছু ব্যবসায়ী জানান, চীনের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা এক পণ্যের কনটেইনারে অন্য পণ্য নিয়ে আসার বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই কার্যক্রম চলে আসছে। কিছু কনটেইনার অনেক সময় ধরা পরে। কিন্তু সব কনটেইনারের সব মালামাল অধিকাংশ সময় চেক না করেই বিভিন্ন ফন্দি-ফিকির ও কাস্টমসের যোগ-সাজেশে বের করে আনা হয়।

অবশ্য চট্টগ্রামের কাস্টমস বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান এ বিষয়ে এখন কঠোর নজরদারি রয়েছে তাদের। তিনি জানান, এ ধরনের জাল জালিয়াতির পর চীন থেকে আসা পণ্যগুলো বেশ কড়াকড়িভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশটি থেকে আসা কনটেইনারগুলোর ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু চীনের কাস্টম বিভাগ কীভাবে এ ধরনের পণ্য ছাড় দিচ্ছে? কোন বাণিজ্য নীতিতে কাজটি করছে সেখানের ব্যবসায়ীরা? এ বিষয়ে জবাব দেবে কে?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলাম লেখক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.