বিশেষ প্রতিনিধিঃ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার ও বুধবার বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। একই সময়ে কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেন তিনি।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা ও বসতভিটা হুমকির মুখে পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু সংকট কোনো একক দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দ্রুত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর ৯ প্রস্তাব
জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ বিষয়ে ৫ প্রস্তাব—
১. বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে দ্রুত গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো।
২. জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য, নিশ্চিত ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৩. অনুন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
৪. অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
৫. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ‘ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন এবং এতে নিয়মিত অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বিষয়ে ৪ প্রস্তাব—
৬. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ আরও দ্রুত ও ন্যায়সংগত করা।
৭. ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর সুরক্ষায় জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা।
৮. জলবায়ুজনিত স্থানচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বহুগুণ বাড়ানো।
৯. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও গৃহহীন মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
জাতিসংঘের কর্মসূচির পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও ব্যস্ত সময় কাটান প্রধানমন্ত্রী। ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে কৃষি উৎপাদনের আধুনিকায়নে ‘স্মার্ট ফার্মার কার্ড’ চালু এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে ভ্যাকসিন উৎপাদনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ও আলোচনায় আসে।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, জ্বালানি সংকট এবং হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা পরিবাহী নৌযান দ্রুত মুক্ত করার বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এদিকে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও হয়েছে। এর মাধ্যমে বিমানের বহরে নতুন করে মোট ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

